শনিবার ৩০ আগষ্ট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
ফিচার

প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইসলাম

মাহমুদুর রহমান ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:৩৭ পি.এম

মাহমুদুর রহমান,প্রকৃতি, পরিবেশ, ভারসাম্য রক্ষায় ইসলাম মাহমুদুর রহমান

প্রকৃতি ও পরিবেশ মানুষের জীবনধারণের অপরিহার্য অংশ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং মানুষকে দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দিয়েছে। কুরআন ও হাদিসে পরিবেশ রক্ষার নানা দিক নির্দেশনা রয়েছে, যা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। পরিবেশ রক্ষায় ইসলামের মৌলিক শিক্ষা:

১. পরিবেশ সংরক্ষণে মানুষের দায়িত্ব

ইসলাম মানুষকে এই পৃথিবীর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে অভিহিত করেছে। তাই মানুষকে প্রকৃতির যত্ন নেওয়া ও সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আল কুরআনে বলা হয়েছে: "তিনিই (আল্লাহ) পৃথিবীতে তোমাদের প্রতিনিধি করেছেন..." (সুরা আন'আম: ১৬৫) এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষ শুধু ভোগ করার জন্য সৃষ্টি হয়নি, বরং তাকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

২. গাছ লাগানোর গুরুত্ব

ইসলাম গাছ লাগানোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করে। গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক এবং এটি মানুষের উপকারে আসে। হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন: "যদি কিয়ামত আসার মুহূর্তেও তোমাদের হাতে একটি চারা থাকে, তবে তা রোপণ করো।" (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ৩/১৮৩) অন্য হাদিসে এসেছে, "যদি কোনো মুসলমান একটি বৃক্ষ রোপণ করে অথবা কোনো শস্য উৎপাদন করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ কিংবা পাখি অথবা পশু ভক্ষণ করে, তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য সদকা (দান) স্বরূপ গণ্য হবে।" (বুখারি, হাদিস: ২৩২০; মুসলিম, হাদিস: ১৫৬৩/১২) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, প্রকৃতির প্রতি যত্নবান হওয়া ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।

৩. পানি সংরক্ষণ ও দূষণ রোধ

ইসলামে পানিকে বরকতময় এবং জীবন ধারণের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পানির অপচয় ও দূষণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তুমি প্রবাহমান নদীর কাছেও ওজু করলেও পানির অপচয় কোরো না।" (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫) এ থেকে বোঝা যায়, প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার এবং অপচয় রোধ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

৪. বায়ু ও পরিবেশ দূষণ রোধ

পরিবেশ দূষণকে ইসলাম কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। রাসূল (সা.) বলেন: "কেউ রাস্তা বা ছায়াযুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করবে না।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯)
এই হাদিসের মাধ্যমেই ইসলাম বায়ু, পানি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করতে উৎসাহিত করে, কারণ মলমূত্র ত্যাগ করার মাধ্যমে পরিবেশ দূষিত হয়, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। ইসলাম বিশ্বাস করে যে, পরিবেশ রক্ষা করা শুধু একজন ব্যক্তির দায়িত্ব নয়, এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। রাস্তা বা ছায়াযুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করার নিষেধাজ্ঞা মানুষের জন্য কেবল অসুবিধার সৃষ্টি করতে পারে, তা নয়, বরং এটি পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। তাই মুসলিমদের এই বিষয়গুলো সচেতনভাবে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

৫. প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি সদয় হওয়া

ইসলাম শুধু মানবজাতির প্রতি নয়, সমস্ত সৃষ্টির প্রতিও সদয় আচরণ করতে বলে। প্রাণীদের প্রতি দয়া ও তাদের অধিকার রক্ষার নির্দেশনা ইসলাম দিয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন: "একজন পাপী নারী শুধু একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেছে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২১০ এবং সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৩২) এই হাদিসে বলা হয়েছে যে, এক পাপী নারী শুধুমাত্র একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। এই হাদিসটি প্রাণীকল্যাণের প্রতি ইসলামের গভীর দৃষ্টিভঙ্গি এবং ছোট ছোট ভালো কাজের গুরুত্ব বোঝায়। এতেই বোঝা যায়, প্রাণীদের যত্ন নেওয়া ইসলাম কতটা গুরুত্ব দেয়।

৬. অপচয় থেকে বিরত থাকা:

ইসলাম অপচয় (ইস্রাফ) নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি ওয়াজু করার সময়ও, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পানির অপচয় থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, যদিও কেউ যদি একটি প্রবাহমান নদীর পাশে থাকে। এই শিক্ষা থেকে বোঝা যায় যে, এমনকি সবচেয়ে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন পানি, তারও সঠিক ও পরিমিত ব্যবহার করা উচিত। এটি প্রাকৃতিক সম্পদের বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে, যাতে তারা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত থাকে এবং অপব্যবহার না হয়।

৭. পরিবেশ রক্ষা:

পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর  কাজগুলোকে ইসলাম সবসময়ই নিরুৎসাহিত করে। যেমন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাস্তাঘাট এবং ছায়াযুক্ত স্থানগুলো নোংরা বা দূষিত করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। তিনি জনসাধারণের জন্য পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এই শিক্ষা থেকে বোঝা যায় যে, ইসলামে পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ এবং সমাজের সবার জন্য একটি স্বাস্থ্যকর, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৮. টেকসই উন্নয়ন:

ইসলাম সম্পদের টেকসই ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। এটি গাছপালা লাগানোর পরামর্শ দেয় এবং নিশ্চিত করতে বলে যে, জমি ও পানি ক্ষতিকরভাবে শোষিত না হয়।

পরিবেশ রক্ষায় ইসলামের শিক্ষা বাস্তবায়নের উপায়
১. গাছ লাগানো ও বৃক্ষ সংরক্ষণ করা। 
২. পানি অপচয় না করা এবং পানি দূষণ রোধ করা। 
৩. প্লাস্টিক ও অন্যান্য ক্ষতিকর বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা। 
৪. বায়ু দূষণ রোধে সচেতন হওয়া। 
৫. প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি সদয় হওয়া। 
৬. পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, যা ইসলামেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন।

শুধু ধর্মীয় উপদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা পরিবেশ রক্ষা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য সংরক্ষণের নির্দেশনা প্রদান করে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে আমরা বুঝতে পারি যে, পরিবেশ সংরক্ষণ করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি ধর্মীয় কর্তব্যও বটে। তাই, আমাদের উচিত প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরিবেশ রক্ষার তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক:
হাফেজ মাওলানা মাহমুদুর রহমান
শিক্ষার্থী
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়